নবান্ন উৎসব

ইভান পাল

বাঙ্গালিদের নামের পাশে একটা বাক্য নি:সন্দেহে জুড়ে দেওয়া যায়। আর তা হচ্ছে~ “ বাঙ্গালি মানেই হলো, বারো মাসে তেরো পার্বণ”। সত্যি ই তাই বাঙ্গালি সমাজ ব্যবস্থায় সেই বারোটি বাংলা মাস জুড়েই থাকে হাজার রকম পালা-পার্বন। মানে এই উৎসব অনুষ্ঠানের কথাই বলছি। সে পৃথিবীর যেকোন বাঙ্গালিদের ক্ষেত্রেই হোক না কেন। আমাদের মানে বাঙ্গালিদের এত্ত পালা-পার্বন যে আমরা তাকে আমাদের মুখের কথায় তেরোটিতেই নাহয় সীমাবদ্ধ করলাম!

বাংলা মাস বারোটা হলেও আমাদের প্রকৃতির রুপ পরিবর্তনের সময় কিন্তু ছয়টা। আমরা এই সময়কেই ঋতু বলি।
তো, বাংলাদেশের ঋতু ছয়টি। তা আমরা সক্কলেই জানি। তাই তো এদেশকে ষড়ঋতুর বাংলাদেশ বলা হয়। প্রতিটি ঋতুই তার রুপ লাবণ্যের পসরা সাজিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে আসে। আর রঙ্গধনুর সাত রঙ্গের মতোই রাঙ্গিয়ে দিয়ে যায় বাঙ্গালিদের জীবনকে।

এবার নবান্ন নিয়ে বলি একটু।
নবান্ন, বাঙ্গালিদের আরেকটি প্রাণের উৎসব। এটা মূলত গ্রাম বাংলার উৎসব,বাংলার কৃষকদের উৎসব।

নবান্ন হলো— ধান কাটাঁর উৎসব। কৃষকরা নতুন ধান কাটা নিয়ে আনন্দ মাতে। কারণ, কৃষকদের কাছে তাদের ধান ই লক্ষী। তাদের আরেকটি সম্পদ।

“নবান্ন” শব্দের নব অর্থ হচ্ছে নতুন। আর অন্ন অর্থ আমরা সবাই জানি — ভাত। যার পুরো অর্থ দাড়ায়ঁ নতুন ধানের তৈরি “অন্ন বা ভাত”। ইংরেজীতে যাকে বলে “New Rice Festival”। অনেকেই মনে করেন, অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটবার সময় এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তখন নতুন আমন ধান কাটা হয়। আর তারপর সেই ধান থেকে যে চাল প্রস্তুত করা হয় সেই চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবই হচ্ছে — এই ~ “নবান্ন উৎসব”।

উইকিপিডিয়া বলছে—
“বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে শস্য উৎপাদনের সময়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করা হয়ে থাকে, তাকেই বলা হয় নবান্ন”।

আমার প্রিয় পাঠকদের কপালে চিন্তার ভাজঁ। আর মনে একটাই প্রশ্ন— নবান্ন হয় অগ্রহায়ণ মাসে। তবে এত্ত তাড়াতাড়ি নবান্ন নিয়ে ঢোল পিটাচ্ছি কেনো?
কারণ, প্রিয় পাঠক নবান্ন উৎসব হয় হেমন্তকালে। আর এটাই হেমন্ত ঋতুর মূল আকর্ষণ। আমরা সব্বাই জানি কার্তিক-অগ্রহায়ণ মিলেই কিন্তু হেমন্ত কাল। আর এখন কার্তিক মাসের প্রায় অর্ধেক দিন শেষ। তো আগামী ১৫ই নভেম্বর এই পল্লী প্রকৃতিতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ভালোবাসার পসরা সাজিয়ে অগ্রহায়ণ মাস আমাদের বাঙালি জীবনে আসবে।
আর তার মানে অগ্রহায়ণ কে বরণ করা কিংবা নবান্ন পালন করার প্রস্তুতি টা এই গ্রামীণ বাঙ্গালি সমাজ ব্যবস্থায় এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে।
আর এজন্যই প্রিয় পাঠক আপনাদের জানান দিতে এলাম — নবান্ন, কি তা নিয়ে টুকিটাকি।

তবে এক্ষেত্রে আবার কেউ কেউ মনে করেন —-
হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয় । তো, এই উৎসব টি যেহেতু পালিত হয় অগ্রহায়ণ মাসে। এখানে, অগ্র অর্থ “প্রথম”। আর “হায়ণ” অর্থ “মাস”। এ থেকে সহজেই ধারণা করা হয়, এক সময় অগ্রহায়ণ মাসই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস।

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এবং অসাম্প্রদায়িক একটি উৎসবের নাম “নবান্ন”। যার সাথে মিশে আছে মাটির চির বন্ধনযুক্ত কিংবা এই ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকোর বাংলায় নরম মাটির ভালোবাসার ঘ্রাণ।

নবান্ন— একটা সময় ঠিক এইরকম একটা দিনে,যখন আলতো শিশির ভেজা পায়ে শীত আসবে আসবে জানান দিতো, তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল তৈরির ধুম পড়ে যেতো। তখন গ্রামের প্রতিটি মধ্যবিত্ত কিংবা বড় বড় (মহাজন পরিবার বলতো) পরিবারের গৃহকত্রী ও বৌ-ঝিরা সব জাত-পাত ভুলে নিজেদের উঠোনে থাকা কাঠের তৈরি সেই ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গতেন। আর সে ধান ভাঙিয়ে চাল তৈরি করতেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পালাক্রমে চলত ধান ভাঙার এই কাজ। আর হেমন্তের এই সময়টাতে গ্রামীণ জীবনের গরিব পরিবারের মহিলারা বড় বড় সব গৃহস্থের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার কাজ করতেন। আর সে ধান থেকে চাল করে দিয়ে বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে পেতেন চাল অথবা টাকা। গরিব মহিলারা পাঁচ থেকে ছয়জনের দল তৈরি করে পালাক্রমে এই ধান ভাঙ্গার কাজ করতেন। এদের মধ্যে ২ থেকে ৩ জন ঢেঁকিতে পাড় দিত আবার আরেকজন ঘরের মধ্যে ধান চাল ওলট-পালট করে দিত।
সাথে আবার চলত আমুদে বাঙ্গালি নারীদের পান খাওয়ার আড্ডা, হাসি আর আনন্দ।
আবার অনেকেই এসময় সুরে সুরে গান ধরতেন। কারণ, বাঙ্গালি জীবনের যেকোন উৎসবেই গান সব সময়ের জন্য প্রাণশক্তি হিসেবে নতুন মাত্রা দিয়ে ছিলো। আর আজো আছে। আর এভাবে ধান ভাঙ্গার কাজ হয়ে গেলে দুধ, গুড়, নারকেল, কলা প্রভৃতির সাথে সদ্য তৈরি নতুন আতপ চাল মিশিয়ে বিভিন্ন পিঠা তৈরি করা হয়। মূলত এক্ষেত্রে পায়েস টা ই তৈরি করা হয়। তারপর এগুলো সব করতে করতে চলে আসে শীত। আর তখন ই চলে পিঠা-পুলির জাকঁজমক পূর্ন উৎসব।

তবে অনেকেরই ধারণা—-
নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্নের তৈরি সেই পায়েস পিতৃপুরুষ, দেবতা এবং বিভিন্ন প্রাণীকে উৎসর্গ করা হয়। তারপর তা আত্মীয়-স্বজনকে পরিবেশন করার পর পরিবারের সকল সদস্য নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।

বাংলা উইকিপিডিয়া বলছে,
“নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা নবান্নের অঙ্গ একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস আছে যে, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য নাকি মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। আর এই নৈবেদ্যকেই বলে “কাকবলী”।”

একটা সময় ছিল যখন নাকি পৌষ সংক্রান্তির দিনেও গৃহদেবতাকে নবান্ন অর্থাৎ নতুন ধানের তৈরি সব পিঠা কিংবা পায়েস নিবেদন করা হতো।

নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন উৎসব ছিল। হিন্দুরা খুব জাকঁজমক ভাবে এই উৎসব পালন করতেন।কিন্তু কালের বিবর্তনে হিন্দু সমাজে এখন আর এই উৎসবের কথা শোনায় যায় না।
এ সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া এবং উইকিপিডিয়া উভয় ই বলছে—–
হিন্দুশাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় নাকি পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে কোন কোন হিন্দু পরিবার প্রথানুযায়ী নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। হিন্দুশাস্ত্র বলছে, নবান্নে শ্রাদ্ধ না করে যদি কেউ নতুন অন্ন গ্রহণ করে তবে তাকে নাকি পাপের ভাগী হতে হয়। তবে বর্তমান হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় এই সব প্রথা খুব একটা চোখে পড়ে না। আস্তে আস্তে সব বিলুপ্ত প্রায়।
তবে মূলত হিন্দুরা নবান্নে তাদের বিভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকমের পুজা-অর্চনা করে থাকেন। আবার সেই সাথে অনেকেই ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়-স্বজনদের নতুন ধানের তৈরি বিভিন্ন পিঠা-পায়েস নিবেদন করেন। আবার অনেক হিন্দু বাড়ির উঠোনে আলপনা অাঁকা হতো। আশ-পাশের পাড়া প্রতিবেশীর বাড়িতে পিঠা-পায়েসের আদান-প্রদান করা হতো। শাঁখের শব্দ, কাসরের শব্দ ইত্যাদিতে গ্রামাঞ্চল হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। গ্রামের প্রতিটি পাড়ায়, বাড়িতে বসত কীর্তনের আসর। কিংবা কোথাও আবার পালাগান-জারিগানের আসর। এসময় মুখোশধারী বিভিন্ন বিনোদন দেওয়ার দলগুলো রাতভর বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাচগান করত। গ্রামীণ জীবনে সে এক ভিন্ন রকম উৎসব উৎসব ব্যাপার!

আর তখন কৃষকের খুশি কে দেখে। গায়েরঁ কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করে নতুন পোশাক কিনত। তবে এখন আর এসব খুব একটা চোখেই পড়ে না।

তবে নবান্ন যে শুধুমাত্র হিন্দুদেরই উৎসব তা কিন্তু একেবারেই নয়। এটা একটা অসম্প্রদায়িক উৎসব। কৃষিভিত্তিক উৎসব। এই বাংলার কৃষকদের উৎসব।

নবান্নে কোন কোন অঞ্চলে বাড়ির মেয়ে-জামাইদের নতুন চালের তৈরি পিঠায় আপ্যায়ন করা হতো। সাথে আবার মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ক’দিনের জন্য নিয়ে আসা হতো। যেটাকে আমাদের বাংলা ভাষায় “নাইয়র” বলা হয়। নতুন ধানের ভাত মুখে দেওয়ার আগে মিলাদ পড়ানো হতো। আর অগ্রহায়ণের প্রথম শুক্রবার গ্রামবাসীরা মসজিদে মসজিদে শিরনি দিতেন। জুমার নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের শিরনি বিতরণ করা হতো।

এবারে আসি নবান্ন নিয়ে বাংলার আদিবাসী সমাজের উৎসবের গল্পে—–

বাংলার আদিম আদিবাসীরাও এই নবান্ন উৎসবটিকে খুব ধুমধামের সাথে উদযাপন করে থাকে।
বাংলার আদিম আদিবাসী — সাঁওতালরা আবার পৌষ-মাঘ মাসে নবান্ন উৎসব টি উদযাপন করে থাকে। এসময় তারা শীতকালীন প্রধান ফসল ঘরে তুলে। আর তাদের ভাষ্যমতে এই উৎসব কে বলে সোহরায় উৎসব। এসময় সাঁওতালরা সাতদিন যাবৎ রাত জেগে গানবাজনা করে। আর সাথে থাকে তাদের প্রধান খাদ্য মদ। আর এভাবেই সাঁওতালরা নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে।

আবার উসুই উপজাতি অন্নদাত্রী দেবী হিসেবে লক্ষ্মীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মাইলুকমা উৎসব পালন করে। আর গারো উপজাতিরা ফসল তোলার পর ফল এবং ফসলের প্রাচুর্যে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পালন করে ওয়ানগাল্লা উৎসব।।

আমি আগেই বলেছি, বাঙ্গালি মানেই হচ্ছে ভোজনরসিক। গান বাজনা আর খাওয়া-দাওয়া ছাড়া বাঙ্গালির কোন উৎসব জমেই না। তো তখন নবান্ন উৎসবে খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতা করা হতো। যে যত বেশি খেতে পারত তাকে উপহার দেওয়া হতো। তবে এ খাবার বলতে মূলত ছিলো বিভিন্ন রকম পিঠা-পুলি।

আর বাঙ্গালি কিংবা বাংলা সংস্কৃতিতে উৎসবের যে অংশ টা সব সময় ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিলো তা হচ্ছে — মেলা। গ্রামীণ যেকোন উৎসবেই মেলা বসতই।

আর গান! লোক গান ছাড়া বাঙ্গালি সংস্কৃতি কি জমে নাকি!

তাই নবান্ন উপলক্ষে ঠিক এখন থেকেই আগামী মাঘ মাস পর্যন্ত চলবে গ্রাম-গঞ্জে গান বাজনার আসর।
এ উৎসবকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে গ্রামীণ জীবনে রাতভর চলে যাত্রাপালা, জারিগান, কীর্তন গান, আর বাউল গানের আসর।।

নবান্ন উৎসবকে ঘিরে অয়োজন করা হতো লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচের মতো আবহমান গ্রাম বাংলার লোকজ সব খেলাধুলার।
নবান্ন হলো, নতুন চালের তৈরি পিঠে খাওয়ার উৎসব। তাই পিঠেপুলির উৎসবের কথা নতুন করে আর নাই-বা বললাম।

আর তাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্রই ধ্বনিত হয়— “আজ নতুন ধানে হবে রে
নবান্ন সবার ঘরে ঘরে”।

আচ্ছা এবার আসি একটু বাংলার কবি সাহিত্যিকদের নবান্ন বন্দনা তে।

আমাদের সকলের শ্রদ্ধাভাজন আমাদের প্রিয় কবিগুরু প্রকৃতির প্রায় সব রুপ নিয়েই সৃষ্টিতে মেতেছেন। কিন্তু হেমন্ত কিংবা নবান্ন নিয়ে তিনি খুব একটা লেখেননি। হয়তোবা শরৎ ~ এর শারদ লক্ষীর পরে আসা নবান্ন তারঁ মনে কোন প্রকার ভাব জাগাতে পারেনি।
কিন্তু আমাদের আরেকজন প্রিয় কবি, আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তারঁ ২টো কবিতাতেই নবান্নের বন্দনা করেছেন। যারমধ্যে একটি হচ্ছে তারঁ ~ অমর-কানন কবিতা। যার ক’টি চরণ প্রিয় পাঠক আপনাদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলাম।
“হেথা ক্ষেত-ভরা ধান নিয়ে আসে অঘ্রাণ,
হেথা প্রাণে ফোটে ফুল,
হেথা ফুলে ফোটে প্রাণ,
ওরে রাখাল সাজিয়া হেথা আসে ভগবান,
মোরা নারায়ণ-সাথে খেলা খেলি অনুখন।”
(অমর-কানন)

“পাকা ধানের গন্ধ-বিধুর হেমন্তের এই দিন-শেষে,
সুরের দুলাল, আসলে ফিরে দিগ্বিজয়ীর বর-বেশে!
আজও মালা হয়নি গাঁথা হয়নি আজও গান-রচন,
কুহেলিকার পর্দা-ঢাকা আজও ফুলের সিংহাসন।”
(কবিতা টি কবি কাজী নজরুল ইসলামের সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থের সুরের দুলাল কবিতার প্রথম কয়েকটি চরণ। যেখানে তিনি স্পষ্ট ই হেমন্তের এবং পাকা ধানের অর্থাৎ নবান্নের বন্দনা করেছেন)

এছাড়াও নবান্নের বন্দনা করেছেন রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি তারঁ আবার আসিব ফিরে কবিতায় লিখেছেন —-
“আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে” (জীবনানন্দ দাশ)

তিনি তারঁ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থেও অগ্রহায়ণের বন্দনা করেছেন।

“অশ্বত্থ পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে
শুকনো মিয়ানো ছেঁড়া,
অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে
হেমন্ত এসেছে তবু”।।
( অঘ্রান প্রান্তর, বনলতা সেন)

তবে অনেকেই ঘুরে ফিরে একটা কথাই বারে বারে এনেছেন আর তা হচ্ছে, নবান্ন হিন্দুদের ই উৎসব। কিন্তু আসলেই কি তাই? একদম ই তা নয় প্রিয় পাঠক।
নব্বান্ন সম্পর্কে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তারঁ জিঞ্জীর কাব্যগ্রন্থের “অঘ্রাণের সওগাত” কবিতায় এ তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারঁ মতে, নবান্ন এই বাংলার কৃষকদের উৎসব, হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের উৎসব।
“ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত?
নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাত।
‘গিন্নি-পাগল’চালের ফিরনি
তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত।
শিরনি বাঁধেন বড়ো বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত!
(অঘ্রাণের সওগাত, কাজী নজরুল ইসলাম)

কলকাতা থেকে প্রকাশিত রমেশচন্দ্র দত্তের “বাংলার কৃষক” (১৮৭৪) গ্রন্থে বলা হয়েছে,
“আমন ধান ভরা বর্ষায় রোপণ করা হয় নিচু জমিতে। ধান কাটা হয় বাংলা সনের অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে। অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসবকে কোথাও কোথাও ‘আমন পার্বণ’ উৎসব ও বলা হয়। আমন ধান কাটা শেষে আনন্দ-উল্লাসের সাথে বিভিন্ন ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান হলো ডিসেম্বরের শীতের মতো উষ্ণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ ভোজন এবং বিভিন্ন উপায়ে তৈরি উষ্ণ ও সুস্বাদু পিঠা বিতরণ।”

তাই এক্ষেত্রে বলতে পারি আমন ধান সম্পর্কিত এ উৎসব টি কোনভাবেই সাম্প্রদায়িক উৎসব নয়। বরং এটি গ্রামের কৃষকদের ভালোবাসার উৎসব। নতুন ধান ই যেহেতু কৃষকদের প্রধান উপজীব্য। তাদের আয়ের প্রধান উৎস। তাই এ ধান ঘরে তোলার সময় সব ধর্মের মানুষ ই নানা আয়োজনে তাদের এই সম্পদ টিকে বরণ করে নেয়। সেখানে হিন্দু রা হিন্দুদের মতো করে বরণ করে, মুসলিম রা মুসলিম দের মতো করে বরণ করে। কিন্তু, এক্ষেত্রে ধর্মের কোন নির্দিষ্টতা নেই।

বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু এলাকায় নবান্ন উৎসব অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার আদমদিঘি উপজেলার শালগ্রাম এলাকাটি নবান্ন উৎসবের জন্য খুব ই বিখ্যাত। আবহমানকাল ধরে এই এলাকায় নবান্ন উৎসব অত্যন্ত সাড়ম্বরের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে।

এছাড়াও উত্তর-পশ্চিম ভারতের ওয়াজিরাবাদ নামক স্থানে নবান্ন উৎসব পালিত হয় বৈশাখ মাসে। সেখানে রবিশস্য গম ঘরে তোলার আনন্দে এ উৎসব টি পালিত হয়। আর বলা হয়, এটা নাকি বৈশাখী নবান্ন উৎসব। ভারতের দক্ষিণাংশেও নাকি এই নবান্ন উৎসবের প্রচলন রয়েছে।

১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা তে আনুষ্ঠানিকভাবে অত্যন্ত সাড়ম্বরের সাথে নবান্ন উৎসব উদযাপিত হচ্ছে।
আর সে বছর থেকেই “বাংলাদেশের জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পরিষদ” প্রতিবছর পহেলা অগ্রহায়ণ তারিখে নবান্ন উৎসব উদযাপন করে আসছে।

আজকাল ইট পাথরের শহুরে সংস্কৃতিতে নবান্ন খুব একটা চোখেই পড়ে না। এখন মানুষ পিঠে পুলিও খুব একটা খায় না। খায় পাশ্চাত্ত্য সংস্কৃতির সেই বার্গার কিংবা স্যান্ডুইচ এর মতো সব খাবারের আইটেম গুলি।

এখন আর গ্রামীন সংস্কৃতিতে সে যত বড় বাড়ী ই হোক না কেনো কেউ নিজ বাড়ীর উঠোনে খুব একটা ধান মাড়াই ও করে না।
করে সেই স্বয়ংক্রিয় মেশিনের যাতা কলে। যেখানে শন শন ভাবে ধান মাড়াইয়ের শব্দ হয়। আর এখনকার গ্রামের বাড়িগুলোতে সেই ধান ভাঙ্গার কাঠের ঢেঁকি ও চোখে পড়ে না।

পড়বে কি করে, আমরা যে এখন বিজ্ঞানের স্বয়ংক্রিয়তার যুগে আছি। আর এ যুগে যে সব মেশিনের মাধ্যমে নিজে নিজেই হয়ে যাবে। কিন্তু এই যে স্বয়ংক্রিয়তা এটা যে আমাদের জীবন থেকে আমাদের এই উৎসব ঐতিহ্য গুলো কে আসতে আসতে মুছে দিচ্ছে!

যাক, তারপর ও বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।
প্রায় প্রতিবছর ই পয়লা অগ্রহায়ণের সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুল তলায় উদযাপিত হয় জাতীয় নবান্ন উৎসব। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর আয়োজনে অনেক আনন্দের সাথে এই নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়। অর্থাৎ আগে যেরকম নবান্ন আসার এক মাস আগে থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে তোড়জোড় শুরু হতো তা আজকাল ছিটেফোঁটা ও চোখে পড়ে না। হয়তো দু একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাত ধরে এই নবান্ন উৎসবটি বাংলায় আজো টিকে আছে। তা না হলে কবেই যে শহুরে সংস্কৃতির ধাক্কায় উবে যেত কে জানে।

পরিশেষে, একটা সময় এই ডিঙ্গি নৌকোর ছোট্ট বাংলাটিতে কিংবা যদি বলি এই আউল-বাউলের বাংলাদেশে অনেক সাড়ম্বরের সাথে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উৎসব উদযাপিত হত। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি আজ বিলুপ্তপ্রায়। আর আজকাল মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নবান্ন উৎসবকে অন্য ধর্মের ধর্মীয় উৎসব বলেই থেমে যায়। আর তাই এই উৎসবটি খুব একটা পালনও করে না। কিন্তু, এটা কোনভাবেই নির্দিষ্ট কোন ধর্মের উৎসব নয়। বরং এটা এই গ্রাম বাংলার কৃষকদের একটা অন্যতম প্রধান উৎসব।

আবহমান গ্রাম বাংলার এই উৎসব টি বেচেঁ থাকুক বাংলা ও বাঙ্গালির প্রাণে। বাঙ্গালির সংস্কৃতিতে। এরকম ই হয়তো আরো অনেক নাম না জানা উৎসব রয়েছে বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে, যা আজকাল অনেকেই জানেন না। তাই, আবারো বলি—- বাঙ্গলা ও বাঙ্গালিদের প্রাণের উৎসব, বাঙ্গালিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসব — নবান্ন বেচেঁ থাকুক বাঙ্গালিদের ভালোবাসায়। বাঙ্গালি সংস্কৃতির উৎসব উদযাপনের তালিকায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here