ইভান পাল

ঋতু বৈচিত্র‍্যের বাংলাদেশে বারোটি বাংলা মাস আর ছয়টি ঋতু নিয়ে আমাদের বাংলার প্রকৃতি পরিবার। এরমধ্যে প্রতি দুটি বাংলা মাসেই থাকে একটি করে ঋতু।

যার হিসেব কষলে হয় বারো মাসে ষড়ঋতু।।

সেই প্রকৃতি পরিবারের প্রতিটি সদস্যই প্রতিবার আমাদের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে আসে আর নতুন ছন্দে, নতুন বর্ণে আর গন্ধ নিয়ে। আর তারা, তাদের নতুন রুপে সমৃদ্ধ করে আমাদের, সমৃদ্ধ করে তাদেরই পরিবার ~ প্রকৃতি পরিবার কে। অর্থাৎ এই প্রকৃতিকে।।

সেই ষড়ঋতুর বাংলাদেশে আজ ১৪২৫ বাংলা সনের শেষ মাসের শেষ দিন।

আজ ৩০শে চৈত্র।

আজ চৈত্র সংক্রান্তি। চৈত্র মাসের শেষ দিন।

ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়!

বাংলার দিকে দিকে চলছে পুরনো বছর কে বিদায় জানানোর প্রক্রিয়া। চলেছে হেসে, খেলে, আনন্দে মেতে এবছরের মতো ঋতুরাজ বসন্তকে বিদায় জানানোর নানান আনুষ্ঠানিকতা।

সেই সাথে চলেছে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রক্রিয়া।

একদিকে লাল কৃষ্ণচূড়ার প্রতিটি পত্রপল্লবে যেমন বসন্তের বিদায়ের জানান দেয় ঠিক তেমনি চৈত্রের শেষ দিনের সকালে প্রখর উত্তপ্ত রোদ পরদিন যে ববর্ষবরণ তার কথাও লুকিয়ে চুরিয়ে বলে দেয়।।

উইকিপিডিয়া বলছে,

“চিত্রা নক্ষত্রে সূর্যের অবস্থান থেকে চৈত্র নামটি এসেছে।”

এটি হচ্ছে, বাংলা সনের দ্বাদশ এবং সমাপনী মাস।।

আর সংক্রান্তি শব্দের অর্থ হচ্ছে, সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করা এবং বাংলা মাসের শেষ দিন কে বোঝায়। আর সেই অর্থেই হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি।।

চলুন প্রিয় পাঠক আপনাদের চৈত্র সংক্রান্তি, এই নামের উৎপত্তি এবং বাংলা সন সম্পর্কে একটু ঘুরিয়ে আনি।

চৈত্র নামের উৎপত্তি:

আমরা যদি আমাদের আদি গ্রন্থ পুরাণের পাতা উল্টায় তবে তাতে এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে—-

সাতাশটি নক্ষত্র আছে যা রাজা প্রজাপতি দক্ষের সুন্দরীকন্যাদের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। রাজা দক্ষ তাঁর সুন্দরী এই কন্যাদের উপযুক্ত পাত্রের সাথে বিয়ে দেওয়ার চিন্তায় উৎকণ্ঠিত ছিলেন।

যোগ্যপাত্র খুঁজে পাওয়া কি সহজ বিষয়? যোগ্যপাত্র পাওয়া না গেলে কি অনূঢ়াই থেকে যাবে তাঁর কন্যারা?

এসব ভাবতে ভাবতে অবশেষে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেল। একদিন মহাধুমধামে চন্দ্রদেবের সাথে বিয়ে হলো দক্ষের সাতাশজন কন্যার। দক্ষের এককন্যা চিত্রা, যাঁর নামানুসারেই চিত্রানক্ষত্র এবং চিত্রানক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়।

রাজা দক্ষের আরেক অনন্য সুন্দরী কন্যা ছিল। যার নাম বিশখা। আর বিশখার নামানুসারে “বিশখানক্ষত্র” এবং বিশখানক্ষত্রের নামানুসারেই বাংলা মাসের প্রথম মাস বৈশাখ মাসের নামকরণ করা হয়।

বাংলা সনের আধূলি গল্প:

আধূলি শব্দটা এই জন্যেই লিখলাম যার কারণ— বাংলা সন নিয়ে পুরো গল্প আজ বলবো না। এনিয়ে আড্ডা হবে অন্য কোনদিন।

আধূলি গল্প শুনুন—-

অনেক অনেক কাল আগে রাজা বাদশার আমলে এই বাংলা ছিলো সম্পূর্ণ কৃষি নির্ভর। তো, তখন হিজরি পঞ্জিকা মতে ফসল উৎপাদন এবং খাজনা আদায়ের কাজ করা হতো।

আবার, এই হিজরী পঞ্জিকা ছিল চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই হিজরী মাসের সাথে বাংলায় ফসল উৎপাদন বা খাজনা আদায় কোন ভাবেই মিলত না। প্রতিবারই খাজনার হিসেব গড়মিল হয়ে যেত। কারণ বাঙ্গলার ঋতু গুলোর সাথে হিজরী মাসের কোনরকম ই মিলই নেই। কারণ, হিজরী সাল চলত চাঁদ দেখার উপর।

তখন বাংলার সিংহাসনে ছিলেন মুগল সম্রাট আকবর। তিনি এই এলোমেলোভাবে খাজনা আদায়কে বন্ধ করে, সুষ্ঠুভাবে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে পঞ্জিকা সংস্কার করার নির্দেশ দেন।

আর তারই নির্দেশে ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পন্ডিত আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জীর অনুকরণে ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় যখন মুগল সম্রাট আকবর সিংহাসন আরোহণ করেন, ঠিক সেই সময় অর্থাৎ ৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ সাল থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন , পরে ” বঙ্গাব্দ ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে।।

আর তারপর থেকেই বাংলায় বারোটি মাস ছয়টি ঋতু এবং সেই সাথে ঋতুভিত্তিক বাংলা। বাংলায় ঋতুবৈচিত্যের সৌন্দর্য তো সেই সাল-টাল আসার আগে থেকেই। কিন্তু, ঐ যে বললাম শুধুমাত্র ফসল কাঁটার সুবিধার্থেই এই বাংলা সনের আগমন। আর আমাদের বারোটি মাস,ছয়টি ঋতু’র প্রাপ্তি।

চৈত্র সংক্রান্তির মূল আকর্ষণ:

চৈত্রের মূল আকর্ষণ থাকে গাজঁন। গাঁজন নামটি শুনেই আমি শতভাগ নিশ্চিত আমার প্রিয় পাঠককূল মনে মনে বলে ফেলেছেন—

অ্যা!  এবার কি? গাঁজন! পাচঁনের নাম শুনেছি কিন্তু গাঁজন!

হ্যাঁ প্রিয় পাঠক, গাঁজন একটি নাম আছে। আর সে নামটি হচ্ছে —-

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে পালিত একটি হিন্দু লোকজউৎসব। এই উৎসব শিব, নীল, মনসা ও ধর্মঠাকুরের পূজাকেন্দ্রিক উৎসব। বাংলা পঞ্জিকার চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে সন্ন্যাসী বা ভক্তদের মাধ্যমে শিবের গাঁজন অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পূজার সঙ্গে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

 

গাজনের ভক্তরা নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন উপায়ে যন্ত্রনা দিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতাকে সন্তুষ্টি করার চেষ্টা করেন। গাজন উপলক্ষ্যে তারা শোভাযাত্রা সহকারে দেবতার মন্দিরে যান।

আর এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন লৌকিক ছড়া আবৃত্তি ও গান করা হয়। ( উইকিপিডিয়া)

 

চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করে আষাঢ়ি পূর্ণিমা পর্যন্ত এ উৎসব উদযাপিত হয়।

বলা হয়ে থাকে, এই উৎসবের সাথে জড়িত রয়েছে হিন্দুধর্মালম্বীদের বিভিন্ন পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতাদের নাম। যেমন—- শিবের গাজন, নীলের গাজন ইত্যাদি।

আর এ উৎসবের মূল লক্ষ্যই থাকে—

পৃথিবীর সকল শক্তির উৎস সূর্য এবং তার পত্নীরূপে কল্পনা করা এই পৃথিবীর বিয়ে দেওয়া।

মূলত: চৈত্র থেকে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্যের যখন প্রচন্ড উত্তাপ থাকে তখন সূর্যের এই তেজশক্তি প্রশমণ ও বৃষ্টি লাভের আশায় এই উৎসব করা হয়।

 

“আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই।
ঠাকমা গেছেন গয়া কাশী ডুগডুগি বাজাই।।”

(শিবের গাঁজন, ছড়া গানে…. উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত)।।

 

চৈত্র সংক্রান্তির আরেকটি প্রধান উৎসব চড়ক।।

চড়ক গাজন উৎসবেরই একটি প্রধান অঙ্গ। মূলত: গাঁজন এবং চড়ক এ দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। আর এই মেলাতে সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছের ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি সব ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হতো ইষ্ট দেবতাকে সন্তুষ্টি করবার আশায়।

 

তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই ধরণের খেলা আজকাল একেবারেই কমে গেছে।

 

চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরী বিভিন্ন ধরণের তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন রকমের ফল-ফলাদি ও মিষ্টি ক্রয়-বিক্রয় হয়। মেলায় বায়াস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি চিত্তবিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে।

কোন কোন অঞ্চলে এই মেলা দুদিন, কোথাও আবার এই মেলা তিন থেকে চারদিন ধরেও চলে।

 

অদিবাসী সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় উৎসব:

 

বাঙ্গালি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরন অণুষ্ঠানের নাম — বৈসাবি।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা উপজাতি সাধারণত পুরাতনবর্ষকে বিদায় এবং নতুন বর্ষকে স্বাগত জানাতে — বিঝু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু উৎসব পালন করে থাকে। ত্রিপুরাদের বৈসুক শব্দ থেকে “বি”, মারমাদের সাংগ্রাই থেকে “সা”, এবং চাকমাদের বিঝু শব্দদ্বয় থেকে “বি” অক্ষরগুলির সমন্বয়ে “বৈসাবি” উৎসবের নামকরণ করা হয়েছে।

সাংগ্রাই-এর মূল আকর্ষণ তরুণ-তরুণীদের জলোৎসব। জলোৎসবের জন্য আগে থেকে সাজসজ্জা  তৈরী করা থাকে। সাথে জলও মজুত করে রাখা হয়। মজুত রাখা জলের দুইদিকে অবস্থান নেয় তরুণ-তরুণীরা। তরুণেরা জলভর্তি পাত্র নিয়ে এসে একজন তরুণীর গায়ে জল ছিটিয়ে দেয়, এর প্রতিউত্তরে তরুণীটিও ঐ তরুণটির গায়ে জল ছিটিয়ে দেয়। আর এভাবেই চলতে থাকে বর্ষবিদায়ের জলোৎসব।

চৈত্র সংক্রান্তির অন্যতম প্রধান খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা, পায়েস ও পাঁচন তৈরী করা হয়ে থাকে। তবে এটা শুধুমাত্র আদিবাসীরাই নয়। অন্যান্য ধর্ম বর্ণের মানুষও এই পিঠা, পায়েশ, পাঁচন তৈরি করে।

 

এদিন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তুই হলো পাঁচন।

 

আচ্ছা, এবার আসি এই পাঁচন টা কি? আমার প্রিয় পাঠক জানতে চাইতেই পারেন।

হয়তো, অনেকেই এর নাম শুনেছেন।  কিন্তু কি সেটা তা আদৌ জানেন না।

 

পাঁচন:

পাঁচন হচ্ছে, সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাক-সবজির মিশ্রণ।

মূলত: পাঁচন হচ্ছে—

বছরের শেষে ঋতু পরিবর্তনের সময়ে রান্না করা বিভিন্ন শাক-সবজির মিশ্রণ।

পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগ-বালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

 

আবার চৈত্র মাসের এই শেষ দিনে নতুন বছর কে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষরা তাদের ঘর-বাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফুল দিয়ে সজ্জিত করে।

মূলত: ধান কাটার উৎসব থেকেই এই বাংলা সন, আর এ বাংলা সন কে কেন্দ্র করেই আবহমান বাংলার বিভিন্ন ধর্ম সম্রদায়ের মধ্যে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংস্কৃতি, বিভিন্ন কৃষ্টি কালচার। বছরের প্রথম দিনকে বরণ করে নিতে আর সাথে বসন্তকে বিদায় জানাতে এই ছোট খাটো কিছু লোকজউৎসব। যেগুলো তো আজকাল শহুরে সংস্কৃতিকে খুজেঁই পাওয়া যায় না।

 

আর এসব এক করলে আর আমরা শুধু পাবো খাটিঁ বাঙ্গালিয়ানা, লাল সবুজের ডিঙ্গি নৌকোর বাংলাদেশ, আর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দ দাশকে।

ভালো থাকুক বাংলা, বাংলাদেশ। আর বেঁচে থাকুক বাংলার এই লোকজসংস্কৃতিগুলো।

শেষ করবো শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতার কয়েকটি চরণ দিয়ে—

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।
ভালো থেকো।

বিদায় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। আমরা আগাম স্বাগত জানাই নতুন বছর ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে।।

আর সত্যি ভালো থাকুক আমাদের এই পল্লী প্রকৃতি, সবুজ পাতা, পাখি কিংবা ছায়া ঢাকা গ্রাম আর বেচেঁ থাকুক বাঙ্গালির অকৃত্রিম স্বপ্নগুলো আবহমান বাঙ্গলার সংস্কৃতিগুলো।

সব্বাইকে চ্যানেল আগামীর পক্ষ থেকে চৈত্র সংক্রান্তি এবং নতুন বছরের আগাম শুভেচ্ছা।

ছবি সংগ্রহ: অনলাইন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here