লিখেছেন তাবাচ্ছুম ফাইজা ||

মোবাইল, বর্তমান এ যুগে যেন এটি ছাড়া চলাই যায় না। কথা বলতে, তথ্য যোগাড় করতে, গান শুনতে, ভিডিও করতে, আরো কত কি! এতসব কাজের কাজী যেন মোবাইলফোন। কিন্তু এই মোবাইলফোনের মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে ধ্বংসের বীজ। আসলে প্রযুক্তি জিনিসটাই এমন। যে যেভাবে ব্যবহার করবে ঠিক তেমনই কাজে দেবে। কিন্তু বর্তমানে স্মার্টফোনগুলোর ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহারটাই যেন বেশি। প্রথম জেনারেশনের মোবাইলফোন গুলোতে এত অপব্যবহারের ভয় ছিল না। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ জেনারেশনে এসে মোবাইল ফোন অনেকটাই অপব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান যুগে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা হয় পড়ছে মোবাইলে আসক্ত।

১৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক ড্যানি বো’ম্যান যে কিনা তার আইফোনে প্রতিদিন অন্তত ২০০ ছবি তুলত। তবুও তার সেলফির সৌন্দর্য নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ডিং সিনশান, চাইনীজ এই ছেলেটি মাত্র ১৫ বছর বয়সে অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তির কারণে রিহ্যাবে যায় এবং তার এক দিনের কম সময়ের মাঝেই সে মারা যায়। জেনা বেটি, ১৪ বছর বয়সী এই মেয়েটি তার ফোন কল ধরতে যেয়ে ফ্রেইটার ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। তালোয়া উইলসন, ১৫ বছর বয়সী এই মেয়েটি তার অনলাইনের ১৮০০০ ফলোয়ার নিয়ে খুব সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু তার শেষ পরিণতি হয় আত্মহত্যা। কিন্তু তাই বলে বড়রাও কিন্তু এর থেকে মুক্ত নয়, The Lancet Medical Journal এ প্রকাশিত একটি ঘটনা ছিল এরকম যে একজন ৩৪ বছর বয়সী যে কিনা ছিল ২৭ মাসের গর্ভবতী,।২০১৩ সালের ক্রিসমাসে টানা ৬ ঘন্টা সে ‘ওয়াটসআ্যপ’ এ ম্যাসেজিং করে। ফলে তার কবজী তে প্রচন্ড ব্যাথা হয় যে সারতে লেগেছিল বেশ কিছু সময়। এছাড়াও আমাদের আশে পাশেই কিন্তু রয়েছে এরকম অসংখ্য উদাহরণ। আর সেগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে এই মোবাইলফোন অথবা স্মার্টফোন। এছাড়াও নিজের বয়স অনুযায়ী অনেক বেশি গভীরতার জিনিস ঘুড়ে বেড়াচ্ছে ইন্টারনেট এ। আর এগুলো দেখবার ও কেউ নেই। ফলে খুব সহজেই মোবাইলের মাধ্যমে চলে যাওয়া যায় এর আওতায়। সব মিলিয়ে সবার হাতেই মোবাইল থাকার কারণে এখন এর অপব্যবহার হচ্ছে অনেক বেশি। আর তা বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরকেই। বাড়াতে হবে সচেতনতা। জানতে হবে এর কুফল। মোবাইলফোনের ভাল ব্যবহার গুলো করার পাশাপাশি খারাপ দিক গুলো নিয়েও তো আমাদের সমান ভাবে।

স্মার্টফোন আসক্তির ফল কত ভয়ানক তার উদাহরণ তো দেখা গেল। এখন আসা যাক মোবাইল আসক্তি কেন কীভাবে হয়, বর্তমান প্রজন্মের উপর এর প্রভাব ও এর থেকে উত্তরণের পথ কি হতে পারে তা নিয়ে।
দ্য আটলান্টিক বর্তমান “আইজেন” প্রজন্মের উপর মোবাইল আসক্তির ফল নিয়ে গবেষণা করে একটি জার্নাল প্রকাশ করে যার নাম “হ্যাভ স্মার্টনেস ডেস্ট্রয়েড এ জেনারেশান”। এই জার্নাল মতে ১৯৮২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া প্রজন্ম কে গবেষক নিল হাউ ও উইলিয়াম স্ট্রাউস মিলেনিয়াল প্রজন্ম বলে নামকরণ করেন। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিজিটাল জ্ঞান৷ পাশাপাশি মানবিক আবেগ আর নৈতিক শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে।
অধ্যাপক টুয়েঙ্গের মতে ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া “আইজেন” প্রজন্মের সাথে মিলেনিয়াল প্রজন্মের বিরাট পার্থক্য দেখা যায়। আশির দশকে একজন কিশোর বাবা-মা কে ছেড়ে বন্ধুদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা মলে ঘুরার কথা কল্পনাই করতে পারত না, একটি ফোন কলের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। অন্যদিকে আইজেন প্রজন্মে এসে বাস্তব বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়ায় কিশোর-কিশোরীরা মেলামেশা বা ডেট করছে কম। নিজের ঘরে শুয়ে বসে মোবাইল ফোন এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে। অনায়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা মলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করলেও সেখানে আবেগটা আর আগের মতো নেই। কথা বলতে গেলে বন্ধুরা বিরক্ত হচ্ছে ফোন থেকে মাথা তুলতে হচ্ছে বলে। বাবা-মায়ের কোনো কথার জবাবে কিশোর তরূণরা “ওকে” “আচ্ছা” বলে জবাব দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তরূণ প্রজন্মের মধ্যে ডিপ্রেশন দেখা দিয়েছে। “নারসিসিজম” বেড়ে গিয়েছে। অনলাইনে অন্য মানুষদের সামনে নিজেকে অপর মানুষটি থেকে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা থেকে ব্যর্থতা, ব্যর্থতা থেকে বিষাদ দিনে দিনে বাড়ছে। নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকার এই ব্যাপারটিকেই বলে “নারসিসিজম”। সব মানুষের মধ্যেই নিজেকে বড় করে তোলার আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু সেটি যখন প্রকট হয় তখন ডিপ্রেশন এমনকি আত্মহত্যার কারণ ও হয়ে দাঁড়ায়। কেবল চিন্তাভাবনায় নয়, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বিশ্রাম বা ঘুমের হার ও আগের প্রজন্মগুলোর থেকে অনেক কম। প্রতিদিনের প্রাপ্তি, জীবন নিয়ে স্বপ্ন মোদ্দা কথা পুরো জীবনযাত্রাই আলাদা এ প্রজন্মের।
শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি, পাঠ্যসূচির পরিবর্তনের জন্য আইজেন প্রজন্ম এর কয়েক বছর আগের প্রজন্ম থেকেও আলাদা হয়ে গিয়েছে। বিশেষত আইফোন, ট্যাব, স্মার্টফোন বা মোবাইল হাতে চলে আসায় যোগাযোগ অনেক বেশি সহজ হয়ে গিয়েছে। মানুষে মানুষে বস্তুগত দূরত্ব কমে গেলেও ভালোবাসা জিনিসটা আগের মতো আর মূল্যবান নেই। অনেক “হ্যান্ডি” হয়ে গেছে মূল্যবোধের বিষয়গুলো। অনেক বাবা-মাও স্মার্টফোন আসক্ত। গন্ডিবদ্ধ জীবনে এটি ছাড়া আর কোনো বিনোদন ও তো নেই। সন্তান প্রশ্ন করলে তাঁরাও ফোনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিচ্ছেন। বস্তুগত দূরত্ব কমলেও, মানুষে মানুষে দিন দিন আন্তরিক দূরত্ব বেড়েই চলছে।
২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেয় তার বিরূপ প্রভাব আইজেন প্রজন্মের উপর রয়েছে। এ প্রজন্ম অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে এ সময়ের মধ্যেই ৫০ শতাংশ কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন চলে আসে। বর্তমানে হাইস্কুল এ ওঠার আগেই ৭০ শতাংশ কিশোর কিশোরীর হাতে স্মার্টফোন চলে আসে।
২০১১ সাল থেকে আত্মহত্যার মাত্রা অবিশ্বাস্যরকম ভাবে বেড়ে গিয়েছে। ২০১২ সাল থেকে কিশোর কিশোরীদের জীবনযাত্রা পুরোপুরি অন্যকম হয়ে যায়। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধিক ফলোয়ার কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা একাকি। তারা ভয়ানক নিঃসঙ্গতা নিয়ে দিনাতিপাত করে। অবসাদগ্রস্ততার জন্য তাদের মধ্যে টেকবেসড নলেজ থাকলেও অন্য যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান বা জ্ঞানার্জনের আগ্রহ অন্য প্রজন্মগুলো থেকে কম। আর এই বিষাদ তাদের মধ্য থেকে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা ও শুষে নিয়ে ফেলছে৷
ভাইভার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা না জানলেও এই প্রশ্ন করাই যায় যে এই ভারত উপমহাদেশে যত লোক ফেসবুক ব্যবহার করে সমগ্র ইউরোপেও তা করে কিনা। দেখা যায় এই যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইনকাম উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপরই মোটা দাগে নির্ভর করে। কারণ উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ঠিক সুন্দর বা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করে না বা করতে পারে না। খেলার মাঠের অভাব, বিনোদন কেন্দ্রের অভাব, জায়গার অভাব, ধূলাবালি, যানজট, খারাপ শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছু মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কিশোর কিশোরীরা না সুন্দর চাইল্ডহুড পায়, না অ্যাডোলেসেন্ট পিরিয়ড টা তাদের রোমাঞ্চকর হয়। ব্যাসিকালি তারা থাকে বোরড। এই বোরডম কাটানোর জন্য তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর ঝুঁকে পরে। একটা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে যদি কিছু টাকা দিয়ে বলা হয় রাঙামাটি ঘুরে দেখতে তাহলে স্বভাবতই তার বসে বসে ফেসবুক চালানোর কথা না। এখনকার শিশুরা সবুজ দেখে না, ঘুরতে পারে না, নানা প্রেশার এ দিনাতিপাত করে, আর সত্যি বলতে তাদের কোনো বন্ধুও থাকে না কারণ আগেকার মতো বন্ধুবান্ধবদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়ার সময় তাদের নেই। তাদের ঢুকিয়ে দেয়া হয় দশ বিশটা কোচিং সেন্টারে। মা-বাবারা বন্ধুবান্ধব অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। সেই থেকেই তারা ঘরকুনো হতে হতে স্মার্টফোন আসক্ত বা গেমআসক্ত হয়ে যায়।
সত্যি বলতে কোনো সমস্যার লেজিট সমাধানের জন্য সমস্যার উপর থেকে চিন্তা না করে তলিয়ে যে কারণটা সমস্যা সৃষ্টি করছে সেটি দূর করা উচিত৷ নাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। অন্য রাষ্ট্রগুলোর কিশোর-কিশোরীদের সুন্দর জীবন এই রাষ্ট্র দিতে পারবে না, কিন্তু নিজেদের বাচ্চাদের সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। সবাই বলবেন, মোবাইল আসক্তি বা যেকোনো ধরণের আসক্তি দূর করার জন্য সচেতনতা প্রয়োজন। প্রয়োজন মা-বাবার বাচ্চাদের দিকে নজর রাখা, দিনে এক দেড় ঘন্টার বেশি ফোন যাতে না চালাতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা, বাচ্চাকে নিয়মের মধ্যে আনা ইত্যাদি ইত্যাদি৷ অবশ্যই। কিন্তু লেখক মনে করেন তার থেকে বেশি যেটা জরুরি সেটা হচ্ছে বাচ্চাদের বোরডম দূর করা, একাকীত্ব দূর করা, তাদের সময় দেয়া, চাপিয়ে না দিয়ে তাদের মতো করে বুঝার চেষ্টা করা, উইকেন্ড এ ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, গাছপালার পাখপাখালির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, ৭ বছরের বাচ্চাটিকে নামীদামি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য কোচিং সেন্টারে ভর্তি না করিয়ে তাকে রাত্রে বেলা বেড টাইম স্টোরিজ পড়ে শোনানো। বাচ্চা এমনিতেই বড় মানুষ হবে এগুলো করলে, এমনিতেই পড়ালেখায় মনোযোগী হবে, আগ্রহ পাবে জ্ঞানার্জনের। লেখক মনে করেন বাচ্চাদের বিভিন্ন জিনিসে আসক্ত হয়ে যাওয়ার পিছনে তাদের বড় হয়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা, সামগ্রিক অর্থে পারিপার্শ্বিক অবস্থা আর শিক্ষাব্যবস্থাই দায়ী। কেননা প্রতিটা শিশুই জন্মায় নিষ্পাপ শিশু হিসেবে। বড় হয়ে একেকজন একেকরকম হয়ে যায়। কারণ তারা একেকরকম পরিবেশে বড় হয়। সুন্দর একটি পরিবার, সুন্দর একটি জীবন ও সুন্দর কিছু মানুষের উপস্থিতি একটি শিশুর জীবনটা সুন্দর করতে পারে। পারে তরূণ প্রজন্মকে বদলে দিতে। মোবাইল ফোনের আসক্তি দূর করতে মোবাইল কেড়ে নিয়ে কড়াভাবে ধমক দিলেই শুধু হবে না বরং বাচ্চাকে জীবনের মূল্য আর অর্থ বোঝাতে হবে। জীবনকে ভালোবাসতে শিখলে এই প্রজন্মও তাদের নিজেদের জন্য যেটি। সবচেয়ে ভালো সেটি করা শিখবে, আর নিজের ভালো থেকেই জাতির ভালো, আমাদের সবার ভালো। যেকোনো প্রকারের আসক্তি থেকে জাতি দূরে থাকুক, স্মার্টফোনের দুষ্টু হাত থেকে নতুন প্রজন্ম বেঁচে থাকুক এই কামনাই করি।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here