নাহিদ আহসান ||

পৃথিবীতে আগমন হলো, ঠাস করে চড় খেয়ে একটা চিৎকার দিয়ে বোঝাতে হলো, আমি আঘাত পেলে শব্দ করতে জানি। বা অনেক শিশুর কাছে এটা খুব হতাশার বিষয়, পৃথিবীতে এসেই মার খেতে হলো। তাও আবার স্বয়ং চিকিৎসক ই মারলো। এইরকম এক অনুভূতি নিয়েই হয়তো মায়ের কোলে উঠে প্রত্যেকটি নবজাতক। মায়ের কোলে খুঁজে পেল তখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবচাইতে ভরসাযোগ্য আর নিরাপদ স্থান। তারপর শিশুরা কি ভাবে তারাই জানে, একেকজনের ভাবনা হয়তো একেকরকম।

কিন্তু পৃথিবীর সব মায়েরাই সন্তানকে প্রথমবার কোলে নিয়ে ঠিক একই রকমের প্রশান্তিই অনুভব করেন যা নিঃসন্দেহে মাতৃত্ব থেকেই আসে। শতো কষ্ট সহ্য করে সন্তান জন্ম দেয়ার পর তাকে স্পর্শ করার অনুভূতি টা যেমন অবর্ণনীয় সুন্দর ঠিক তেমনই কিছুক্ষন পরেই ‘ এই সন্তান একদিন বড় হবে, একদিন ছেড়ে চলে যাবে বা আমিই যাব ‘ এই বিষয়গুলো মনে আসার কষ্টটা ঠিক ততোটাই অবর্ণনীয় করুণ। মায়ের শরীরটা যেমন আনন্দে আঁতকে উঠে ঠিক তেমনটাই আঁতকে উঠে বিচ্যুতির ভয়ে। একজন বাবার ক্ষেত্রে মায়ের তুলনায় অনুভূতির পার্থক্য বজায় থাকলেও, একজন বাবাও ঠিক ততোটাই দ্বিধাহীন ভাবেই কোলে তুলে নেন তার সন্তানকে যদিও একদিন কেউ একজনের হাতটা ছেড়ে দিতে হবে। পৃথিবীতে যে আসে, সে একদিন তো যাবেই।

একজন মায়ের কাছে সন্তানের জন্য ভালোবাসা ঠিক অমলিন রয়ে যায়। জন্মের পর কোলে তুলে নেয়া আর একুশ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে কেক কাটার সময় জড়িয়ে ধরার অনুভূতিগুলো প্রায় একই রকম হয় বলেই মত প্রকাশ করেছেন একদল গবেষক।

যদি আমরা সম্পূর্ণ একটা প্রজন্মের জীবনপথ চিন্তা করি, তাহলেই বিষয়টা একদম স্পষ্ট হয়ে যায়। একজন সন্তানকে লালনপালন করে, সবসময় পর্যাপ্ত খেয়াল রেখে তাকে বড় হতে সাহায্য করা হয়। একজন সন্তান সম্পূর্ণ তার মা-বাবার ছায়াতেই বেড়ে উঠে। একদম অল্প সংখ্যক ব্যতিক্রম থেকে যায় সবখানেই। তো, একসময় সন্তানেরা বেড়ে উঠে এবং স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই জীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ে বাবা-মায়ের উপর প্রশ্ন উঠে সন্তানের পক্ষ থেকে, যে তারা সত্যিকার অর্থেই যথেষ্ট আদর পেয়েছে কিনা, যথেষ্ট নিঃস্বার্থভাবে লালিত হয়েছে কিনা, যথেষ্ট খেয়াল রাখা হয়েছিলো কিনা তাদের, যথেষ্ট শাসন করা হয়েছে কিনা বা যথেষ্ট আবদার পূরণ করা হয়েছে কিনা। এই প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে একজন বাবার জন্য বা মায়ের জন্য সবচাইতে কষ্টদায়ক প্রশ্ন। এইরকম প্রশ্নবিদ্ধ প্রায় সবার ক্ষেত্রেই হতে হয়। যখন এতোগুলো দিন-রাত নিঃস্বার্থে একটা মানবসন্তান লালনপালন করে বড় করে তোলে এবং এই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হয় তখন এটা আসলেই হৃদয়ের ভিতরটা একদম দুমড়ে মুচড়ে দেয়। বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের বেড়ে উঠা খারাপ লাগার একটা কারণ এটা।

নিজের সবচাইতে প্রিয় বস্তুকে আমরা সবসময় আগলে রাখি অনেক যত্নে। কিন্তু নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় সন্তানগুলোকে এভাবে আগলে রেখে বড় করে তোলার পরে একসময় যখন এই সন্তানগুলোর আর আগলে রাখা যায়না বা সন্তানকে এই হিংস্র পৃথিবীতে বিরাজ করার জন্য ছেড়ে দিতে হয়, যখন নিজের প্রিয় সন্তানকে ছেড়ে দিতে হয় একলা বেঁচে থাকা শেখার জন্য, অই অনুভূতিগুলো খুব কষ্টদায়ক বাবা-মায়ের জন্য। পৃথিবীতে চলতে গেলে অনেকরকম খারাপ বিষয়বস্তুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পার পেয়ে বেঁচে থাকতে হবে। করতে হবে সংগ্রাম, হোক নিত্যদিন কিন্তু করে যেতেই হবে। সন্তানেরা এটাকে নেয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কিন্তু বাবা-মায়ের কাছে নিজেদের সবচাইতে প্রিয় বস্তুটাকে আলাদা করে ফেলার মত আঘাতস্বরূপ। এই হলো আরেকটি কারণ, যার জন্য বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের বেড়ে উঠা খারাপ অধ্যায়।

একজন নবজাতক ধীরে ধীরে বড় হয়। শিশুকালে সে যা ই দেখে তা ই আয়ত্ত করতে চায়। এমনকি আমরা ই বুদ্ধি করে তাকে অইসব জিনিশই প্রদর্শন করি, অইসব আচরণ ই প্রদর্শন করি যেই বিষয়গুলো তার আয়ত্ত করা প্রয়োজন। ঠিক স্বভাবসুলভভঙ্গিতেই একজন শিশু চায় বেড়ে উঠতে। হতে চায় ততোটুকু বড় যতোটুকু তার বাবা-মা। বড় হবার এই ইচ্ছেটা থেকে যায় ততোদিন পর্যন্ত যতোদিন না সে আঘাতের পর আঘাত পেয়ে এটা স্বীকার কর‍্যে বাধ্য হচ্ছে আমার বেড়ে উঠা বিষয়টা সত্যিই ততোটাই খারাপ যতোটা ভাল। মানুষ বড় হতে হতে বিভিন্ন অধ্যায় অতিক্রম করে। একটা অধ্যায়ের পর থেকে তার অভিভাবকদের সাথে মনোমালিন্য লেগেই থাকে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সন্তান চায় নিজের হাতে করতে, কিন্তু দূরত্ব বেড়ে যাবার ভয়ে বাবা-মা চায়না তার সন্তান নিজে নিজে পৃথিবীটাকে মোকাবেলা করুক। সন্তান চায় স্বভাবের তাড়নায় আর বাবা-মা চায় ভালোবেসে। ভুল বুঝাবুঝির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যতোটুকু সন্তান প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ততটুকুই বাবা-মা। এই সম্পর্কগুলো হঠাৎ করে মলিন হয়। আমরা এটাকে বলি “বাস্তবতা”। কিন্তু পৃথিবীর কোনো নিয়মের জন্য এমনটা হয়না। এমনটা হয়, হবার পিছনে দায়ী সন্তান,বাবা,মা।

আমরা একটা সময় খুব বড় হতে চাই যখন কোনো কাজ করতে হয়না। সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে আশেপাশের সবাই ই কাজগুলো করে দেয় ঠিকমত। আমরা উপদেশ দেবার মত বৃদ্ধ হতে চাই। কিন্তু ঠিক অই অধ্যায়েও যখন একাকীত্বে জর্জরিত হই, তখন শৈশবে কাটানো মায়ের কোলের, বাবার কাঁধের কথা ভীষণ মনে পড়ে। আমরা আবার ফিরে যেতে চাই শৈশবে এবং আমরা মানুষদের বলে বেড়াই, ‘একজন মানুষের বেড়ে উঠা ঠিক যতোটা আনন্দের, ততোটাই কষ্টের। ‘

পিতামাতা চায় তাদের সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাটা একদিন অনেক বড় হোক, তাদের সন্তানের পরিচয়ে সমাজের মানুষ তাদের চিনে রাখুক, মনে রাখুক। কিন্তু রাতের আঁধারে ঘুমের মধ্যেও কখনো না কখনো বুকের ভেতর একটা আর্তনাদ চেপে রেখে নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, আমার সন্তানের সাফল্য বা পরাজয় দেখার জন্য কি আমরা বেঁচে থাকব? যদি আমার সন্তান হেরে যায়, তাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেয়ার জন্যেও কি আমি থাকব না? এই রাতগুলোতে তারা ঘুমাতে পারে না। তারা বুঝতে পারে, কষ্ট টা কোথায়। এবং এর পরেও তারা মনের সুখে প্রত্যেকটা সকালে তাদের সন্তানের হাসি দেখে বাঁচতে চায়, তারা চেয়ে বেড়ায় তাদের সন্তান একদিন অনেক বড় হবে এবং তারা হবে সেই সাফল্য উদযাপনকারী।

একজন সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠে, বাবা-মায়ের সাথে আনন্দ ভাগ করে, কষ্ট ভাগ করে, বিভিন্ন কাজে ভুল করে শিক্ষা পেয়ে, বাবা-মায়ের অবস্থানে চলে যাওয়া এবং তারপর নিজের সন্তানদের কাছ থেকে সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, তিরস্কার, ঘৃণা ইত্যাদি পেয়ে বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হওয়ার পুরো বিষয়টা, পুরো সময়টা, পুরো যাত্রাপথটা ঠিক ততোটাই কষ্টের, যতোটা আনন্দ সন্তান জন্মানোর পরে তাকে কোলে নেবার সময় হয়েছিলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here