ফারহানা ইসলাম

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ব্রিটিশ ঐতিহাসিকগণ যখন তাদের লেখায় নবাব কে নির্দয়,উদ্ধত,সেচ্ছাচারী হিসেবে তুলে ধরে কলঙ্কিত করেছিল তখন সর্বপ্রথম ১৮৯৮ সালে অক্ষয় কুমার “সিরাজউদ্দৌলা” গবেষণা মূলক বইয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেন।

১৮৬১ সালের মার্চের ১লা মার্চ পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে ছিলেন সমাজ সেবক, আইনকর্মী,এবং একজন ইতিহাসবেত্তা। এছাড়াও সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি, চিত্রকলা ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এছাড়াও প্রযুক্তিতেও তার অবদান ছিলো অনেক।

অক্ষয়কুমার বাংলাদেশে প্রযুক্তি শিক্ষার উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি ইউরোপের শিল্পবিপ্লব এবং তাদের উন্নতি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধুনিক শিল্প বা কলকারখানা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশের বিশেষ কোনো উন্নতি হবে না। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজশাহী রেশম শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় রাজশাহী থেকে রেশম রপ্তানি হতো। ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসিসহ বহিরাগত অনেকেই রাজশাহীতে রেশম ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উন্নত প্রযুক্তির অভাবে রাজশাহীর রেশম চাষ ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, রপ্তানিও কমতে থাকে। অক্ষয়কুমার এই অবস্থার উন্নতিকল্পে জেলা পরিষদের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় জমিদারদের আর্থিক অনুদানে রাজশাহীতে ১৮৯৮ সালে একটি রেশম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অক্ষয়কুমার নিজে রেশম স্কুলের সম্পাদক ও শিক্ষক ছিলেন। কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত সীতানাথ গুহ ছিলেন প্রধান শিক্ষক। উভয়ের প্রচেষ্টায় স্কুলের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ স্কুলে গুটিপোকার উন্নত বীজ এবং তা থেকে সুতা প্রস্তুত, সুতা রং করে বস্ত্র তৈরির নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হতো। রেশম স্কুলের সাহায্যে অদক্ষ শ্রমিকদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দক্ষ বা যুগোপযোগী করে তোলা হতো। বিদ্যালয়ের সফলতায় রাজশাহী থেকে গুটিপোকার বীজ রপ্তানি বেড়ে যায়, এখান থেকে জাপান, ইতালি, ইংল্যান্ড এবং উপমহাদেশের নানা স্থানে বীজের চালান যেতে থাকে। অযোধ্যার মহারাজ রামপাল সিং পণ্ডিত শীতল প্রসাদ উপাধ্যায়কে এ বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান, ফিরে গিয়ে শীতলপ্রসাদ অযোধ্যায় নয়টি রেশম কারখানা চালু করেন। অক্ষয়কুমার শিল্পে প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ে তখনকার পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালিখি করেন। রেশম শিল্পের উন্নয়ন এবং জাতীয় শিল্পের বিস্তারে অক্ষয়কুমারের দৃষ্টান্তে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে রেশম চাষ শুরু করেন, যদিও উদ্যোগটি বেশি দূর এগোতে পারেনি। তবে রশম স্কুলের ধারণা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে বয়ন বিদ্যালয় চালু করেন।

অক্ষয়কুমারের প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের জন্য সারা ভারতে স্বীকৃত হন। ১৯০০ সালের ৩১ জানুয়ারি হিন্দুরঞ্জিকা পত্রিকায় প্রকাশিত নিচের সংবাদটি এই স্বীকৃতির উত্তম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো।

“”তাতার প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্ষয় বাবু। পার্শী ধনকুবের মিঃ জেমশেঠজী তাতা একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্থাপনের জন্য গবর্মেন্টের হাতে ৩০ লক্ষ টাকা প্রদান করিয়াছেন। উক্ত বিদ্যালয়ে কি প্রণালীতে শিক্ষাদান আবশ্যক, তা সম্বন্ধে শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর শ্রীযুক্ত পেডলার সাহেব রাজশাহী সেরিকালচারাল স্কুলের মাননীয় শিল্প……[অস্পষ্ট] শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার মৈত্র বি, এল মহাশয়ের অভিমত জানিতে চাহিয়াছেন। তিনি শীঘ্রই তাহার অশেষ পাণ্ডিত্যপূর্ণ সুদীর্ঘ মন্তব্য গবর্মেন্টের সমীপে পেশ করিবেন। আমরা তাহার মতামতের সংক্ষিপ্ত মর্ম্ম সঙ্কলন করিতেছি, বরান্তরে তাহার অবিকল অনূদিত পাঠ উদ্ধার করিবার ইচ্ছা রহিল:-

“আমাদের দেশের শিক্ষিত যুবকদের জ্ঞান কার্য্যক্ষেত্রে প্রকাশিত হইবার অবসর পায় না তাহার প্রধান কারণ যে, তাহাদের সে জ্ঞান শুধু কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহাতে চর্চ্চা রাখিবার উপায় নাই। যদিও বা দুই এক জন কোন নতুন শিক্ষা তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে সমর্থ হন। কিন্তু তাহার আনুসাঙ্গিক অবশ্য প্রয়োজনীয় কলকারখানাদির অভাবে তিনি তাহা শুধু লেখনী মুখে ব্যক্ত করিয়াই জ্ঞানতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন। জ্বদিচ সে নবাবিস্কৃত তত্ত্ব বৈদেশিক শিল্প ব্যবসায়ীর হস্তে পড়িয়া তাহাদের ধনাগমের পথ সুপ্রশস্ত এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিরুৎসাহী ও দারিদ্র্যাবর্দ্ধন করিয়া থাকে। আমাদের মস্তিষ্কের ফল তাহারা উদারে উপভোগ করেন।

ইউরোপের জার্ম্মানী, সুইজারল্যান্ড গভর্নমেন্ট যেমন তত্রত্য অধিবাসীবৃন্দকে “হাতে কলমে” শিক্ষাদান করিয়া থাকেন, তোমাদেরও [ভারত গভর্নমেন্ট] কর্তব্য আমাদিগকে সেই প্রণালীতে শিক্ষাদান করা। পূর্বাপর আমাদের ঈদৃশ অনুযোগের উত্তরে তোমরা টাকার অভাব প্রদর্শন করিয়া আমাদের মুখবন্ধ করিয়াছিলে। কিন্তু এখন সে আপত্তি করিলে চলিবে না। আমাদেরই একজন স্বদেশ বন্ধু এই সৎকার্য্য জন্য বহু লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছেন। এ অর্থ যদি কেবল কলমের কুফল প্রসবিনী শিক্ষাতেই ব্যয়িত হয় তবে মনে করিতে হইবে তাহার অসদ্ব্যবহার হইয়াছে। আপাতত আমাদের দেশে একদেশদর্শিনী লেখনী-শিক্ষায় কোনো ফল হইবে না। কলম-জ্ঞান আমাদের যথেষ্ট হইয়াছে—অন্ততঃ যে টুকু হইয়াছে তাহাতেই হাতের কার্য্য কিছু কিঞ্চিৎ চলিতে পারে। এস্থলে অক্ষয় বাবু, আত্ম-অভিজ্ঞতা হইতে দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়াছেন। আমি নিজে অতি সামান্য সামান্য যন্ত্র ও দ্রব্য সংযোগে যে সকল রাসায়নিক বর্ণবৈচিত্র এবং সুমেদুর কৌষেয়-তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছি। তাহা হইতে কলমের জ্ঞান যে আমাদের যৎ-সামান্যও নাই তাহা বুঝা যায় না। পরন্তু, সুবৃহৎ যন্ত্রাদি এবং সুপ্রশস্ত কারখানা পাইলে, এই তত্ত্বজ্ঞান দ্বারাই অনেক বেশি কার্য্য এবং দেশের প্রভূত ধনাগমের আনুকূল্য করা যাইতে পারে। সুতরাং এই প্রকৃষ্ট প্রণালীতে শিক্ষাদান আমি সর্ব্বতোভাবে গৃহিত বিবেচনা করি এবং গভর্নমেন্টকে নির্ব্বান্ধাতিশয্য সহকারে অনুরোধ করি।””

বাংলাদেশ তো বটেই,সারা ভারতেই অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতো প্রতিভাধর বাঙালী বিরল। অথচ তার মৃত্যুর ৮৭ বছর পরও এদেশে তার কোনো স্বীকৃতি মেলেনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here