সবাইকে চমকে দিয়ে তুরস্কে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এবং একে পার্টির প্রধান রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। সম্প্রতি একে পার্টির জনপ্রিয়তা হ্রাস, ইয়ি পার্টির উত্থান, সাদাতের বিরোধী দলে অবস্থান, অর্থনৈতিক অবনতি, দেশকে ঋণে জর্জরিত করা, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াসহ নানা কারণে আর ঝুঁকি না নিয়ে নির্বাচনকে এগিয়ে এনে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন এরদোগান।

এরদোগানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে বাহবা দেই অধিকাংশ সময়, বিশেষ করে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। ফলে এই নির্বাচন তুরস্কের জন্যে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। তাই নির্বাচন বিষয়ে কিছু আলাপ সামনে আনা জরুরি বলেই মনে হচ্ছে।

আগাম নির্বাচন কেন দিতে হচ্ছে এরদোগানকে

আগাম নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এর ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, সংসদীয় আসন সংখ্যা বৃদ্ধিকরণসহ কারণে দেওয়া গণভোটের ধাক্কাটা বেশি ক্ষতি করার সুযোগ পাবে না একেপিকে। তাছাড়া অভ্যূত্থানের পর জনমত জরিপে ব্যক্তি এরদোগানের জনপ্রিয়তা ৭৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। সেই তুমুল জনপ্রিয়তা ঠিক এক বছরের মাথায় ৫১ শতাংশে নেমে আসা এরদোগানের নিজের জন্যই সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একটি আগাম নির্বাচন আবশ্যক ছিল এরদোগানের জন্য।

জাতীয় এই নির্বাচনকে ঘিরে অন্যান্য নির্বাচনী দলগুলো জোট গঠনের যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছিল ২০১৯ সালকে সামনে রেখে, এই আগাম নির্বাচনের ঘোষণায় তা অনেকটা ভেঙে পড়বে। কোন তড়িঘড়ি জোট গঠন সেই দলগুলোকে খুব লাভবান করবে বলে মনে হচ্ছে না। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, বিরোধীদল যদি জোট গঠন করেও তবে কাকে এরদোগানের বিপক্ষে শেষমেশ প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা দেবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হবে।

তুরস্কের রাজনীতির মাঠে নতুন চমক হিসেবে হাজির আছে ইয়ি পার্টির (IYI) উত্থান। জাতীয়তাবাদী দল মেহেপে (MHP) থেকে বেরিয়ে আসা নবগঠিত এই ইয়ি পার্টির উত্থান রুখে দিয়ে ভোটযুদ্ধে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইবে একেপি। এর আগে দেখা গেছে, ইয়ি পার্টি যাত্রা শুরু করেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল কয়েক মাসেই। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০১৯ এর নির্বাচন। কিন্তু হঠাৎ নির্বাচন সামনে আসায় তা তাদের বেশ অপ্রস্তুত করবে বলে অনেকের আশঙ্কা। এছাড়া তাদের হাতে পর্যাপ্ত এমপি না থাকায় (কমপক্ষে ২০ জন) নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণই অনেকটা অনিশ্চিত ছিল।

দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, ঋণ, উৎপাদন ভিত্তিক অর্থনীতি না হয়ে ব্যাপক আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া, দেশের বেকার সমস্যা বৃদ্ধি, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদির কারণেও সরকার তীব্র সমালোচনার শিকার হচ্ছিল বিগত কয়েক বছর ধরে, যা তাদের ভোটের হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এমতাবস্থায় আগাম নির্বাচনকেই তারা নিরাপদ ভাবছে বলে মনে হচ্ছে।

কিছুদিন ধরে এরদোগানের সমালোচনায় সরব সাদাত পার্টি যেভাবে আলোচনার মধ্যবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল, তা এই ঘোষণার পর হ্রাস পাবে অনেকাংশে। জনমত জরিপে, সাদাত পার্টি আমিরের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে সাদাতের জনপ্রিয়তার পালে হাওয়া অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া সিএইচপি ও ইয়ি পার্টির ওপর সাদাতের আমির তেমেল কারামোল্লাওলুর প্রভাব যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল দিন দিন এর সাথে এরদোগানের বিপরীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুলকে যদি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো যেতো তাহলে ২০১৯ এর নির্বাচন এরদোগান ও একেপির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে পরিণত হতে পারতো।

নির্বাচন ঘোষণার পরবর্তী অবস্থা

আগাম নির্বাচনের ঘোষণার পরপর সিএইচপি তার দল থেকে ১৫ জন এমপিকে পদত্যাগ করিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ইয়ি পার্টিতে যোগদান করিয়েছে। সম্প্রতি জরিপে দেখা গিয়েছে, ইয়ি পার্টির জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ইয়ি পার্টিকে টিকিয়ে রাখতে বিরোধী দলসমূহ উঠে পড়ে লেগেছে। এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।

তুরস্কের নির্বাচনের নিয়মানুসারে, সংসদে একটি দলের সর্বনিম্ন ২০ জন এমপির একটা গ্রুপ থাকা বাধ্যতামূলক। তাহলে তারা সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এরদোগান যে প্ল্যান করেছিলেন ইয়ি পার্টিকে রুখে দেয়ার তা হয়ত সফলতার মুখ দেখবে না।

কী হতে পারে আগাম নির্বাচনের ফলাফল

বেশ কিছুদিন ধরে একেপির সামগ্রিক ভোট কিছুটা হ্রাস পেলেও তা তেমন ধাক্কা দিবে না দলটিকে। এছাড়া মেহেপের (MHP) ভোটও একেপির পকেটে, যেহেতু তারা দুজনই জোটবদ্ধ আছে। তবে হুট করে ইয়ি পার্টির আগমনে মেহেপের ভোট অনেকটা হ্রাস পেয়েছে, কারণ ইয়ি পার্টির অনেক নেতাই মেহেপে থেকে বের হয়ে এসেছে। সেই সাথে ইয়ি পার্টির জনপ্রিয়তা অনেকটা অবাক করার মতো। অন্যদিকে সিএইচপির ভোট নির্দিষ্ট, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাদের ভোট দেয়। এছাড়া কুর্দি প্রশ্নে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (এইচডিপি) এখন সাইডবেঞ্চে চলে গিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা: কে হবেন এরদোগানের প্রতিপক্ষ

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কে হবে তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা চলছে বিরোধী শিবিরে। তবে দুয়েক দিনের মধ্যে কিছু বলা যাচ্ছে না। আব্দুল্লাহ গুলের নাম শোনা গেলেও বিরোধী পক্ষের কাছে সে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা প্রশ্ন সাপেক্ষ, অনেকেই তাকে পছন্দ করছে না। অবশ্য শেষমেশ সব ধোঁয়াশা থেকে নিজেকে মুক্ত করে গুল নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রইলেন। ইয়ি পার্টি প্রধান মেরেল আকসেনারের জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে অনেকে বলছেন- তার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তুরস্কের রাজনীতিতে মহিলাদের এরকম দায়িত্বে কেউ দেখতে চায় না, জনগণ তো আরও না। এছাড়া রয়টার্সের শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কুর্দিশ-পন্থি এইচডিপি থেকে সেলাহারতিন দেমিরতাস লড়তে পারেন। এছাড়া সাবেক বিচারপতিসহ আরো কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত যদি এই নির্বাচন এরদোগান-মেরেল এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ও, সেখানে এরদোগানের বিজয় নিশ্চিত।

তবে গত নির্বাচনের আলোকে যাদের ভোট ১ শতাংশেরও নিচে ছিল, অর্থাৎ সাদাত পার্টি, তারা এ নির্বাচনে সরব রয়েছে। তুরস্কের অর্থনৈতিক নানা বিষয়াদি যেমন বাজেট, ঋণ, উৎপাদন, রপ্তানিসহ নানা সমস্যা ও সমাধান বিষয়ক সেমিনার, ইসরাইল-বিরোধিতা ইত্যাদি বিষয়ে আওয়াজ তুলে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে দলটি। দেখা যাচ্ছে সাদেত পার্টির প্রধান আজ যা বলছেন, কাল সোশাল মিডিয়াতে তা নিয়েই আলোচনা, সংবাদ-মাধ্যমেও তাই। তবে সাদাত পার্টি থেকে শেষ অব্দি কে পাচ্ছেন মনোনয়ন, তা দেখার সময় ঘনিয়ে আসছে।

এরদোগানের বিজয় প্রশ্নে

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের বিজয় অনেকটা নিশ্চিত, কিছুটা লড়াই হলেও হতে পারে। তবে না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ২০১৯ এ নির্বাচন হলে তা বর্তমান প্রেসিডেন্টের জন্য পুলসিরাত পার হওয়ার মতো কঠিন অবস্থা হতো এটা অনেকটা নিশ্চিত। হুট করে এক বছর সামনে এগিয়ে নিয়ে এসেও যদি এ নির্বাচনে এরদোগান না জেতে সেটা বেশ অস্বাভাবিক ঠেকবে। তবে কোন অঘটন না হলে বিজয় মোটামুটি নিশ্চিত।

তুরস্কে আগাম নির্বাচনের সিলসিলা

তুরস্কের রাজনীতির মাঠে ব্যক্তি প্রভাব সবসমসয়ই বেশি। একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করেই তার দল ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তুরস্কের ইতিহাসে এ নিয়ে ৪ বার আগাম নির্বাচনের ঘোষণার ঘটনা ঘটলো। আগের ৩ বারই আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আদনান মেন্দেরেসের কথা আমরা সবাই জানি যাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এক সময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় এই নেতা প্রথমবারের মত ১৯৫৭ সালে আগাম নির্বাচন দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও অর্থাৎ ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেও আগাম নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন আদনান।

দ্বিতীয়বার আগাম নির্বাচনের ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালে। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওজাল আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলে তার পরাজয় হয় এবং ক্ষমতার আসন থেকে বিচ্ছিন্ন হন। তার পার্টির নামগন্ধও এখন খুঁজে পাওয়া যায় না, কারণ তাদের রাজনীতির কোন আদর্শিক ভিত্তি ছিল না। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বিশেষের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন করেছিল। নির্বাচনের পরেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয় তারা।

এরদোগানের আগে শেষবারের মত ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এজেবিদ মেহেপে ও দলটির প্রধান বাহচেলির চাপে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। মেহেপে সংসদে ঢুকতে না পারলেও একেপি গিয়েছিল, সাথে ছিল জেহেপে।

জানি না, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। তুরস্কের ভাগ্য আকাশে কি আছে তা তুরস্কের জনসাধারণই নির্ধারণ করবে আগাম এই নির্বাচনে। যাই ঘটুক, ভবিষ্যতে আগত যেকোন কঠিন ঝড়ে তুরস্কের জনগণ যেন ১৫ জুলাই রাতের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে পারে সেই কামনা করি। তবে নির্বাচন যেন কোন বিভাজনের প্রতীক না হয়। যেন এই নির্বাচন তুরস্কের জাতিস্বত্তার ঐক্য ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে– সেরকমটাই প্রত্যাশা সকলের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here