ইভান পাল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গত ২১~শে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়।

শিল্পকলাবিদ্যা ( Arts) চর্চার জন্য ভারতে যে কয়টি বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ( বিশ্ববিদ্যালয়)  রয়েছে, তারমধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত এই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় একটি।

২০১১সাল থেকে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মহান শহীদ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ ( ছবি সংগ্রহ: গুগোল)

 

আর প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও তারা যথাযোগ্য মর্যাদায় ২১~শে ফেব্রুয়ারি পালন করেন।

গুগোল

এদিন সকাল ৭ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি প্রভাত ফেরির আয়োজন করা হয়। এসময় প্রভাতফেরিতে যোগ দেন উত্তর কলকাতা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ও রবীন্দ্রভারতী ছাত্র সংসদের সভাপতি বিশ্বজিৎ দে বাপ্পা সহ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।।

ছবি সংগ্রহ: মহুয়া নওশিন

 ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যারা আত্মত্যাগ করেছিলেন সেসকল অকুতোভয় মহান শহীদদের প্রতি শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এসময় শিক্ষার্থীরা খালি পায়ে হেঁটে শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অপর্ণের মধ্য দিয়ে একুশের মহান শহীদদের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। আর মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে ভারতের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।

প্রভাতফেরি টি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে।

মাঝে আবার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত পথসভার ও আয়োজন করা হয়। যেখানে — ৫২’র ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী মহান ভাষা শহীদদের প্রতি ও ভারতের জম্মু কাশ্মীরে জঙ্গি হামলায় নিহত সিআরপিএফ (কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী) জওয়ানদের প্রতি এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি র মধ্যরাতে বাংলাদেশের ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে ১মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

এরপরেই র‍্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে শেষ হয়।

আর র‍্যালি শেষে সকাল সাড়ে নয়টায় ২১শে’র মহান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।

এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীরা মহান বাংলা ভাষার শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। বিকেলের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন — বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন (কলকাতা), বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এর ডিন সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।।

এসময় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজ্যুওয়াল আর্টস ডিপার্টমেন্ট এর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্বজিৎ সরকার বাপ্পি মহান ভাষা আন্দোলনে নিহত শহীদদের শ্রদ্ধা জানান সাথে তাদের( বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের) মহান ২১শে ফেব্রুয়ারির আয়োজনে সহযোগিতা করবার জন্য তৃণমূল ছাত্র পরিষদ, রবীবন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ভারত শাখাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

উল্লেখ্য, ৫২’র ভাষা আন্দোলনে নিহত মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তে কিছু মেধাবী,  টগবগে তরুণের যে আত্মত্যাগ তা কখনোই বাঙালিদের ভুলবার নয়। তাদেরঁ জন্য ই আজ আমরা আমাদের মায়ের মুখের ভাষা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি।

চলছে, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আলপনা আকারঁ কাজ…

তো রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে—  তরুণ এই শিক্ষার্থীরা, এই শিল্পীরা তাদেরঁ দেশের এই যে ঐতিহ্য, তাদেরঁ সংস্কৃতির যে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন তাদের ভাষা, তাদেরঁ (বাঙালিদের) আবেগ, এটাই তাদের ভালোবাসা।।

 

২১শে ফেব্রুয়ারি র আলপনা…

আর সে আবেগ কিংবা ভালোবাসা যাই বলি না কেনো এই মহান শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে, শহীদদের প্রতি সন্মান জানাতে তরুণ শিল্পীরা রাত ভর রং তুলির আচড়ে পুরো রবীন্দ্রভারতীর ক্যাম্পাস কে সাজান। এদেশীয় ঐতিহ্যের সূত্র ধরে চলে পুরো ক্যাম্পাসে আলপনা আকাঁর কাজ।

আলপনা আকাঁর ফাকেঁ শিক্ষার্থীদের একাংশ…

আর এসব কাজে ভারতের শিক্ষার্থীরাও দেশ-বিভেদ সবকিছু ভুলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে যোগদেন। হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করেন রাত জেগে। আর তখন জানি মনে হয় — দুদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ এক নতুন মেলবন্ধন। এ বন্ধন ভালোবাসার বন্ধন কিংবা মৈত্রির বন্ধন। তখন মনে হয়, এপার বাংলা-ওপার বাংলা বুঝি সব এক! কাটাঁতারার বেড়াটা বোধ হয় না হলেই ভালো হতো।।

রাত জেগে আলপনা দেওয়ার পর, ভোরের আলো তখন উকিঁ দিচ্ছে… ( ছবি :মহুয়া নওশিন)

আর এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজ্যুয়্যাল আর্টস ডিপার্টমেন্টের বাংলাদেশি  শিক্ষার্থী মহুয়া নওশিন এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের জন্য আগেরদিন অর্থাৎ ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকি। চলে রাতভর পুরো ক্যাম্পাসে আলপনা আঁকা আর ক্যাম্পাস সাজসজ্জার কাজ। আর আমরা শুধু এখানে এ কাজে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নই, আমাদেরকে ভারতের শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ আমাদের বন্ধু কিংবা সহপাঠী যাই বলি তারাও আমাদের সাথে এ সাজসজ্জার কাজে হাত লাগান। আর এভাবেই সব্বাই একসাথে প্রাণ খুলে হাসি ঠাট্টা আর মজা করতে করতেই আমাদের ২০শে ফেব্রুয়ারির রাতের অস্ত যায় কিংবা মহান ২১শে ফেব্রুয়ারির এক নতুন ভোরের সূর্য ওঠে। আর ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের জন্য পুরো ক্যাম্পাস তখন সজ্জিত হয়।”

শেষ মূহূর্তের তুলির আচড়ে ২১ ফেব্রুয়ারি কে স্মরণ করতে, ভোরের আলোয় রবীন্দ্রভারতীর ক্যাম্পাস…

দেশের বাইরে অধ্যয়নরত কিছু বাংলাদেশি তরুণ – তরুণী তাদের প্রতিদিনকার পড়াশুনা কর্মব্যস্ততার মাঝেও যে বাংলাদেশি সংস্কৃতির আবহটা কে এভাবে আগলে রেখেছেন, দেশের প্রতি তাদেরঁ যে আবেগ, মহান ভাষা শহীদদের প্রতি তাদেরঁ যে সন্মান, শ্রদ্ধাবোধ তা আজীবন অটুট থাকুক।

চ্যানেল আগামী পরিবারের পক্ষ থেকে রইল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভাই-বোনদের (এপার বাংলা-ওপার বাংলা উভয়ই) প্রতি মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা।।

শুধুমাত্র রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের ও জানাই মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

এভাবেই বাচুকঁ বাংলা ভাষা, বাচুকঁ আবহমান বাঙলা ও বাঙ্গালির সংস্কৃতিগুলো।।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here