মাহমুদ আব্দুল্লাহ

১৯৯৮ সালের মে মাস। আফ্রিকার দুই দেশ ইরিত্রিয়া আর ইথিওপিয়ার মাঝে শুরু হলো লড়াই। সীমান্ত বিরোধ, সন্ত্রাস আর বিতর্কিত এলাকা নিয়ে এই যুদ্ধ টিকে রইল দীর্ঘ দুটি দশক। হর্ন অব আফ্রিকা খ্যাত এই অঞ্চলে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া দেশদুটি আবার বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের অন্যতম। এই সময়কালে তারা ব্যয় করেছে কোটি কোটি ডলার। হতাহত হয়েছে দশ হাজারের বেশি মানুষ। গৃহহীন রিফিউজি হয়েছে বহু। ইরিত্রিয়ার বিপক্ষে অভিযোগ ছিল আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে ইথিওপিয়ার ওপর আক্রমণ চালানোর। যুদ্ধের শেষদিকে সমস্ত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল ইথিওপিয়ার দখলে চলে যায় এবং ইথিওপিয় বাহিনী ইরিত্রিয়ার ভেতরে অগ্রসর হয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ইরিত্রিয়া-ইথিওপিয়া বাউন্ডারি কমিশন একটি সীমানা প্রস্তাব করে সীমান্ত শহর বাদমে’তে স্থাপন করার জন্য, যা ছিল উভয়দেশের সংঘাতের কারণ। যদিও ইথিওপিয়া সীমান্ত শহর বাদমে ও সেরোনো থেকে তার দখলদারিত্ব ছেড়ে দেয়নি। অবশেষে ২০১৮ সালের পাঁচই জুন সংঘাতের বিশ বছর পর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ইথিওপিয়ান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ইরিত্রিয়ার দাবি মেনে নিয়ে দীর্ঘ দু’দশকের সংঘাতের ইতি টানেন।

এ বছর অনুমিত নোবেল লরিয়েটের আলোচনায় সবচেয়ে চড়া দাবি শোনা যাচ্ছিল পরিবেশবাদী আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থানবার্গের পক্ষে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডা আর্ডার্ন ও আবি আহমেদের পক্ষেও আলোচনা চলছিল। ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের নোবেল প্রাপ্তির দাবী জানিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন! কিন্তু সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আফ্রিকার সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতাগ্রহণের দেড় বছরের মাথায় শান্তিতে নোবেল জয় করলেন। যা পাওয়ার পর নোবেল কমিটির সেক্রেটারির সাথে এক ফোনালাপে আবি আহমেদ বলেছেন, “আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এই পুরষ্কার আফ্রিকাকে দেওয়া হয়েছে, ইথিওপিয়াকে দেয়া হয়েছে। এবং আমি কল্পনা করতে পারছি আফ্রিকার নেতৃবৃন্দ এটাকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করবেন আমাদের মহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।” নোবেল কমিটি পুরষ্কার ঘোষনার পর জানিয়েছে, ‘নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ২০১৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ইথিওপিয়ান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা স্থাপনে তার উদ্যোগের কারণেই আমাদের এই সিদ্ধান্ত। এই পুরস্কার তাদের জন্যও যারা ইথিওপিয়া, পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকায় শান্তি আননয়নের জন্য নিরলস কাজ করছেন।’

এছাড়া আফ্রিকার অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মি. আবি আহমেদকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছে, আবি আহমেদ যে জন্য পুরষ্কার পেয়েছেন তা সম্পন্ন হওয়া থেকে এখনও অনেকটা দূরে। নোবেল পুরষ্কারের সাথে স্বাভাবিক কিছু বিতর্ক সব সময়ই জড়িয়ে থাকে। ইথিওপিয়ায় ১৯৭৫ সালে তিন হাজার বছরের পুরনো ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং বামপন্থী শাসনের সূচনা হয়, এমনকি আবি আহমেদের সরকারও বামপন্থী মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন। তবে আবি আহমেদ তার সরকারকে একটি সংস্কারবাদী বামপন্থী ধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, যা কিনা তার সরকারকে আফ্রিকায় আমেরিকার অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আবি আহমেদের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় মুসলিম গোত্র ওরোমোর জনসংখ্যায় মুসলিমদের সংখ্যা কমিয়ে এনে একটি খৃষ্টানপ্রধান গোত্রে রূপান্তরিত করবার৷ আবি আহমেদ নিজে ওরোমো মুসলিম ছিলেন, পরবর্তিতে ধর্ম পরিবর্তন করে খৃষ্টান হন। তাই নোবেল শান্তি পুরষ্কারের ফলে আফ্রিকায় শান্তি পুরোপুরি আসছে, বিষয়টা এরকম নয়।

একজন আবি আহমেদ:
আবি আহমেদের জন্ম ১৯৭৬ সালে ইথিওপিয়ায় এক মুসলিম বাবা ও খৃষ্টান মায়ের সংসারে৷ তার পড়াশোনা একাধারে দেশে এবং বিদেশে৷ তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অভ গ্রিনউইচ থেকে এমএ করেন ট্রান্সফর্মেশনাল লিডারশিপের ওপর, যুক্তরাষ্ট্রের এশল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধীন ইথিওপিয়ার একটি কলেজ থেকে এমবিএ এবং আদ্দিস আবাবা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন পীস এন্ড সিকিউরিটি ইস্যুজের ওপর৷ তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ২০১০ সালে ওরোমো পিপলস ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে। বর্তমানে তিনি ইথিওপিয়ার ক্ষমতাসীন জোট ইথিওপিয়ান পিপলস রেভ্যুলেশনারি ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এবং তার নিজের দল ওরোমো ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মাঝে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলে আসা অচলাবস্থা নিরসন করার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন আবি আহমেদ আলী৷

সূত্র: বিবিসি, উইকিপিডিয়া, ফেসবুক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here