সানিলা আহমেদ

“তুমি পারবে না!”

তুচ্ছতা, হেয় হওয়া, সাধারণের মাঝে বড়ই সাধারণ। একজন মানুষকে কোন কাজ করতে দেওয়ার আগেই তাকে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু শুধুই কি সাধারণ বিবেচনা করা হয়? না, তা হয় না! প্রতিটি মুহূর্তে একজন মানুষ অপর এক মানুষকে বিবেচনা করে, কিন্তু, অতি তুচ্ছ ভাবে।

কেউ যদি কোন কাজ করতে চায়, তবে সবার আগে তাকে বলা হয়, “তুমি পারবে না!” । কেন এরকম হয়? কে কোন কাজ পারবে কি পারবে না, সেটা তো আগে কখনোই নির্ধারণ করা যায় না। কার কোন কাজে যোগ্যতা কতটুকু, সেটা তো কাজটি শুরু করার পর বোঝা যায়। কিন্তু, একটা কাজ শুধু শুরু করলেই কি তার কর্তার যোগ্যতা নির্ধারণ করা যায়? না, একদমই না।

এক এক জন মানুষের কাজ করার শক্তি, ধরণ, দৃষ্টিভঙ্গি সব ভিন্ন থাকে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তো কাজ করার সময়টিও ভিন্ন হবে। যেহেতু মানুষের চিন্তা ভাবনা, আচার আচরণ, শক্তি, মানসিক বল ভিন্ন থাকে, তাহলে তার কাজ সম্পন্ন করার সময়, ফলাফল, সেটাও ভিন্ন থাকবে। কারণ এই সব কিছু সমন্বয় করেই কিন্তু কাজ সম্পন্ন হয়। খাদ্যের উপর ভিত্তি করে যেমন শক্তি পাওয়া যায়, তেমনি চিন্তা ভাবনা, ধারণা, প্রচেষ্টা সবকিছুর উপর ভিত্তি করে কাজের ফল পাওয়া যায়।

একটি কাজ, একজন মানুষ, একটি মস্তিষ্ক, দুটি হাত। যদি, আমরা কাজ বা প্রচেষ্টাকে একটি কম্পাসের সাথে তুলনা করি, তাহলে প্রত্যক্ষ কম্পাসটি হল মানুষের কাজ, একটি তলের উপর যে বৃত্ত আঁকা হয় সেটি হল কর্মের ফল। এখন, প্রশ্ন আসে কর্তা কে? কম্পাস দিয়ে বৃত্ত আঁকা সহজ, কিন্তু অন্যের সামর্থ্যও তো দেখতে হবে! যদি একটি বড় মানুষকে ঐ কম্পাস দিয়ে একটি বৃত্ত আঁকতে দেওয়া হয়, তবে সে অতি সহজেই একটি বৃত্ত আঁকতে সক্ষম হবে। যদি একটি বাচ্চাকে দিয়ে ঐ বৃত্ত আঁকতে দেওয়া হয়, তবে তার আঁকতে একটু সমস্যা হবে, হয়ত একটু নড়ে যাবে, হয়ত বৃত্তটা একটু চ্যাপ্টা হয়ে যাবে, কিন্তু বৃত্ত কিন্তু ঠিকই আঁকা হবে। আর, একটি ছোট বাচ্চাকে দিয়ে আঁকতে দেওয়া হলে, তার যথেষ্টই সমস্যা হবে। কিন্তু, এমন কি কেউ থাকবে, যে ঐ কম্পাস দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকতে পারবে না? না, এমন কেউ হবে না।

বৃত্তটি সবাই আঁকতে পারবে, কিন্তু সবার বৃত্ত এক হবে না। এইখানে, যে বড় মানুষটি বৃত্ত আঁকলো, সে যথেষ্ট অভিজ্ঞ বলেই সে একটি নিখুঁত বৃত্ত আঁকতে সক্ষম হয়েছে। বাচ্চাটি যে বৃত্ত আঁকলো, তার অভিজ্ঞতা একটু কম বলে তার আঁকাটি অতোটা সুন্দর হয় নি, কিন্তু তার বৃত্তকে একটি বৃত্ত বলা চলে। আর, যেই ছোট বাচ্চাটি বৃত্ত আঁকলো, তার অভিজ্ঞতা একদমই নেই, তবুও সে কিন্তু একটি বৃত্ত আঁকলো। হ্যাঁ, হয়তোবা সে বৃত্তটি আঁকাবাঁকা হয়েছে, কিন্তু সে কিন্তু একটি বৃত্তই এঁকেছে, কোন চতুর্ভুজ কিন্তু নয়।

আমাদের বাস্তব জীবনও তাই। আমরা যদি এই কাজের ফলকে একটি স্কেল এ ১-১০ এর মধ্যে মান নিতে পারি, তবে দেখব, এক এক জনের মান এক এক রকম। কারো মান ৯, কারো মান ৮, কারো মান ৭, কারো বা মান ৬। কিন্তু, ৬ এর নিচে আর যাবে না। কেন? কারণ, মানুষ কখনোই কোন কাজ অর্ধেক চেষ্টা দিয়ে করে না। অর্ধেক চেষ্টা দিয়ে করলে আজ মূর্খও কর্মক্ষেত্রে অর্থ উপার্জন করতে পারত না। হয়তোবা চেষ্টার পরিমাণটি কম, কিন্তু তা অতি কম কিন্তু না। তাহলে, যে ব্যক্তি তার ৬০% শ্রম দিয়ে একটি কাজের ফল বের করেছে, সে তাহলে কেন আরেকটু শ্রম দিয়ে তার মান বারাতে পারবে না? আমি বলি, যদি একজন মানুষ তার অর্ধেকের বেশি শ্রম দিয়ে কাজ সম্পন্ন করেছে, তাহলে বাকিটুকু করা তো কোন ব্যাপারই হবে না। যে ব্যক্তি তার ৬০% দিয়েছে, সে আরেকটু শ্রম দিয়ে ৭০% করতে পারে। একবার যদি সে দেখে, যে তার উন্নতি হয়েছে, তাহলে সে কাজটি সুন্দরভাবে করতে অনেক আগ্রহ পাবে। কিন্তু, এই যে সমাজ, মানুষ, আর কথা, তাদের কিছু তুচ্ছ ব্যবহার আর কথায় এই আগ্রহী মানুষগুলো তাদের বল হারিয়ে ফেলে। যদি এই মানুষগুলোকে একটু প্রেরণা দেওয়া হয়, এই বলে যে, তারা যেহেতু তাদের অর্ধেকের বেশি চেষ্টা দিয়ে কোন কাজের ফল ঐ অনুযায়ী বের করতে পেরেছে, তাহলে সে বাকিটুকুও পারবে। কারণ ৬০% বা ৭০%, সে কিন্তু অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এই ফলাফলে এসে পৌঁছিয়েছে, তাহলে বাকি ১০-২০% যাওয়া তো কোন ব্যাপারই না!

কাউকে তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়। কারণ একজন মানুষ কখনোই কোন কাজ তার অর্ধেক বা তারও কম প্রচেষ্টা দিয়ে করে না, বরং এর থেকে বেশি মন ও শ্রম দেয়। সুতরাং এই যে হেয় করা, এটি যদি আমরা আমাদের সমাজ থেকে বাদ দিতে পারি, তাহলে সত্যিই, আমাদের সমাজ কত উন্নতি করবে! আপনি হার মানবেন না, আপনার চেষ্টাতেই সমাজের মুখ লুকিয়ে আছে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here